জীবনে চলার পথে এমন মুহূর্তের সম্মুখীন হয়ে মানুষ যা সে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। প্রতিটি মানুষ চায় তার জীবন হোক সুখে-শান্তিতে পরিপূর্ণ। কিন্তু আদতে অনেকেরই জীবনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে অপ্রত্যাশিতভাবে। জীবনের চলার পথটি সকলের মসৃণ হয়না। ঠিক এরকমই একটি গল্প হল যৌনকর্মী সীমা'র । তাঁর জীবনের গল্পটি শুনলে মনে হবে সত্যিই সে নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে।
বাংলাদেশের খুলনার মেয়ে ছিল এই সীমা । কিশোরী বয়সে সে চলে গিয়েছিলো সিলেটের হযরত শাহজাহান এর মাজারে। তারপর ২০০২ সালে কমলাপুর স্টেশনে তার সাথে পরিচয় হয় এক যৌনকর্মীর। ওই যৌনকর্মী সীমাকে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। সেখানেই তাঁর স্বামীর সাথে সীমাকে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার চেষ্টা করে ওই যৌনকর্মী। কিন্তু কিছুতেই সীমা বশ্যতা স্বীকার করে না। তারপর এক দালালের কাছে বিক্রি হয়ে যায় অসহায় সীমা। তারপর ভোগ্যপণ্যের মতো বারবার বিক্রি হতে থাকে এই মেয়েটি, যে সমাজে মাথা উঁচু করে সুখে-শান্তিতে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু তার সমস্ত স্বপ্নগুলি কে গলা টিপে হত্যা করা হয়। ম্লান হয়ে যায় তাঁর জীবনের বাঁচার ইচ্ছা। কিন্তু তবুও কোনরকমে মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে বেঁচে রয়েছে এই ৩৩ বছরের মেয়েটি। যৌনজীবনে এক খদ্দেরের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সীমার। তার সাথে বিয়ে হয় তাঁর। কিন্তু এই দেহ ব্যবসার করাল অন্ধকার থেকে মুক্তি মেলে না সীমার। তাঁর স্বামীসহ শশুর শাশুড়ি প্রত্যেকেই জোর করে শরীর বিক্রিতে বাধ্য করতো সীমাকে।
বাপের বাড়িতেও যেতে পারেনি সীমা। একবার সেখানে গিয়েছিল সে, কিন্তু তার স্বামী এমনই বদনাম করে দিয়ে আসে বাপের বাড়িতে যে সেখানে ঠাঁই হয়নি সীমার। প্রতিদিন তীব্র নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে সে। বর্তমানে খোলা আকাশের নীচেই শরীর বিক্রি করতে হয় সীমাকে। এখন কোন হোটেল বা কোন ঘরও জোটেনা তাঁর। বাংলাদেশের বিজয় সরণি, ফার্মগেট, চন্দ্রিমা উদ্যান সহ বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার ধারে, ঝোপে ঝাড়েই চলে তাঁর এই অন্ধকার জীবনের গল্প।
সারাদিন পর ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে ঘুমান সীমা। তার একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে রয়েছে। প্রতিদিন স্বামী গুনে গুনে কন্ডোম ধরিয়ে দেয় সীমার হাতে। সারারাত অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে ভোরবেলা গিয়ে সেই কন্ডোমের হিসাব দিতে হয় নেশাখোর স্বামীকে । প্রতি কন্ডোম পিছু একশো টাকা। হিসাবে গরমিল হলে বা এই কাজ করতে না চাইলে স্বামীর হাতে বেধড়ক মার খেতে হয় সীমাকে। এই ঘটনা চোখে জল এনে দেবে যেকোনো অনুভূতিশীল মানুষের চোখেই। এই মেয়েটির জীবনের লড়াই সত্যিই খুবই কষ্টকর।
অকর্মণ্য, নেশাখোর স্বামী তাঁর জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে সমস্ত সুখ-শান্তি- বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা। শুধুমাত্র সীমা দুচোখ ভরে স্বপ্ন দেখে একদিন হয়তো এই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবে সে।
কিন্তু সেই দিনটা কবে আসবে তার অপেক্ষায় শুধুমাত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে যায় সে ।